"আমায় থাকতে দাও তোমার সাথে"
আমিনা কুতুব। নাম শুনে চেনা চেনা লাগছে?
হ্যাঁ! সাইয়েদ কুতুবের বোন!
আমিনার সাথে তার বরের প্রথম দেখা হাসপাতালের বেডে। সেখানেই বিয়ে ঠিক। অবাক করা ব্যাপার হলো, তার বর কামাল আল সানানিরিকে সে দেশের সরকার তখন গ্রেফতার করে রেখেছে। জেল থেকে বের হতে আরো বিশ বছরের মত বাকি। তারপরেও আমিনা এমন মানুষের সাথে ঘর করতে রাজী হয়েছিলেন। মিশরের সরকার সেসময় বন্দীদের ওপর কেমন অত্যাচার করতো তা সবাই কম-বেশি জানেন। না জানলে আহমাদ রায়েফের ‘নব্য ফেরাউনের কারাগার’- বইটি পড়তে পারেন।
.
পাশবিক সে অত্যাচারে কালাম আল সানানিরি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে যান। তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সেখানেই আমিনা কুতুবের সাথে বিয়ে হয়ে গেলো। অন্য কোনো মেয়ে হলে হয়তো কোনোদিন রাজীও হতো না, মেনেও নিতো না। তবে আল্লাহ তা‘আলা আমিনা কুতুবের মনে দৃঢ়তা ঢেলে দিয়েছিলেন। স্বামীকে তিনি বাকিটা জীবন সমর্থন দিয়ে গেছেন, যেভাবে খাদিজা (রা) সমর্থন দিয়ে গেছেন রাসূলকে (সা)। মজার ব্যাপার, আমিনা কুতুব তার স্বামীর চেয়ে বয়সে প্রায় দশ বছরের বড়ো ছিলেন।
.
প্রায়ই আমিনা তার স্বামীকে জালিমের কারাগারে দেখতে যেতেন। তাকে সান্তনা দিতেন। কায়রো থেকে কানা জেলে যাওয়া একটা মেয়ের জন্য সহজ ব্যাপার ছিল না। ট্রেনে করে যেতে হতো। বিয়ের কয়েক বছর পর কামাল আল সানানিরি তার স্ত্রীর চেহারায় ক্লান্তি আর ধকল দেখতে পেলেন। তাই তিনি ডিভোর্সের দিকে ইঙ্গিত করে আমিনাকে একটি কবিতা পাঠালেন-
“আমি চাই না তোমার সুখের পথে কাঁটা হতে,
কিন্তু আমি যে পারব না জালিমের কথায় মাথা নোয়াতে।”
আমিনা সে কবিতার জবাব দিলেন প্রেমের মালা পরিয়ে-
“আমায় থাকতে দাও তোমার সাথে,
জিহাদের যে পথ নিয়ে যায় জান্নাতে।”
.
আমিনা হয়তো সেসময় কল্পনা করতে পারেননি, অপেক্ষার পালা ঠিক কতটুকু দীর্ঘ হবে। ১৭ বছর কারাবাসের পর কামাল ছাড়া পান। আমিনা ফিরে পান তার স্বামীকে। আমিনার ভাষায় সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে সুখের বছর। ভালোবাসার বছর। এতোদিন স্বামীকে তিনি দেখেছেন গারদের ওপাশ থেকে। আজ পেয়েছেন একদম কাছে। বাহুডোরে।
.
তবে সে সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। জালিম সরকার আবার কামালকে গ্রেফতার করে। এবার অত্যাচার এতই তীব্র ছিলো যে এক মাসের মাথায় কামাল আল সানানিরি তার রবের সানিধ্যে চলে যান। কামালের লাশ তার পরিবারের কাছে এই শর্তে সোপর্দ করা হয় যে, এর ওপর কোনো জানাযা পড়া হবে না।
.
আমিনার কানে পৌঁছায় স্বামীর মৃত্যুর খবর। যার পথ চেয়ে এতটা বছর একা ছিলেন তিনিই তো আর নেই। জীবনের বাকি ২৬ বছর তিনি স্বামীর স্মৃতিগুলো গভীর ভালোবাসায় হৃদয়ে ধারণ করে কাটিয়ে দেন। জান্নাতে কামালকে সাথী হিসেবে পাবেন এই আশায় আর কারো সাথে ঘর বাঁধেননি। আমিনা কুতুব একজন উচ্চ শিক্ষিতা রমণী ছিলেন। তারপরেও শুধু স্বামীর জন্য নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে আমৃত্যু কষ্ট করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা আমিনা কুতুবসহ সেসব ত্যাগী বোনদের ওপর রহম করুন, যারা এভাবেই তাদের স্বামীর কষ্টকে মাথা পেতে নিয়েছেন। জীবনসঙ্গীর প্রতি ভালোবাসায় দুনিয়ার লালসাকে বিসর্জন দিয়েছেন।
কামালের শোকে বিহ্বল হয়ে আমিনা একটি কবিতা লেখেন যা আজো মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়-
.
هل ترانا نلتقي ام انها … كانت اللقيا على أرض السرابِ
و دفنا الشوق في اعماقنا … و مضينا في رضاء و احتسابِ
قد تعاهدنا على السيرِ معـًـا … ثم اعجلتَ مجيبـًا للذهابِ
فليعد قلبك من غفلاته … فلقاء الخلد في تلك الرحاب
قد تركت القلب يـدمي مثقلاا … تائها في الليل في عمق الضباب
لم يعد يبَرق في ليلي سَنااهُ … قد توارت كل انوار الشهاب
-
“তুমি কি চাও আবার আমাদের দেখা হবে?
নাকি দেখা হয়ে গেছে মরীচিকাতে?
আমাদের গভীর ভালোবাসা আমরা নিজেদের মধ্যেই কবর দিয়েছি,
আর আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশায় সংগ্রাম করেছি।
আমরা শপথ করেছিলাম, চলব সারাটা জীবন একসাথে,
ওগো! তুমি তো বিদায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত চলে গেলে।
ওগো! তুমি ঘুম থেকে সময়মত উঠে পড়বে,
কারণ, আমাদের আসল দেখা তো সেখানেই (জান্নাতে) হবে।
তুমি আমার হৃদয়টাকে ফেলে গেছো রক্তাক্ত অবস্থায়,
ফেলে গেছো গভীর রাতের গাঢ় কুয়াশায়।
আজ আর আমার রাতগুলো থেকে আলো আসে না,
তারাগুলোও আজ জ্যোতিহীন হয়ে হারিয়ে গেছে দূর অজানায়।”
(সংগৃহীত)
হ্যাঁ! সাইয়েদ কুতুবের বোন!
আমিনার সাথে তার বরের প্রথম দেখা হাসপাতালের বেডে। সেখানেই বিয়ে ঠিক। অবাক করা ব্যাপার হলো, তার বর কামাল আল সানানিরিকে সে দেশের সরকার তখন গ্রেফতার করে রেখেছে। জেল থেকে বের হতে আরো বিশ বছরের মত বাকি। তারপরেও আমিনা এমন মানুষের সাথে ঘর করতে রাজী হয়েছিলেন। মিশরের সরকার সেসময় বন্দীদের ওপর কেমন অত্যাচার করতো তা সবাই কম-বেশি জানেন। না জানলে আহমাদ রায়েফের ‘নব্য ফেরাউনের কারাগার’- বইটি পড়তে পারেন।
.
পাশবিক সে অত্যাচারে কালাম আল সানানিরি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে যান। তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সেখানেই আমিনা কুতুবের সাথে বিয়ে হয়ে গেলো। অন্য কোনো মেয়ে হলে হয়তো কোনোদিন রাজীও হতো না, মেনেও নিতো না। তবে আল্লাহ তা‘আলা আমিনা কুতুবের মনে দৃঢ়তা ঢেলে দিয়েছিলেন। স্বামীকে তিনি বাকিটা জীবন সমর্থন দিয়ে গেছেন, যেভাবে খাদিজা (রা) সমর্থন দিয়ে গেছেন রাসূলকে (সা)। মজার ব্যাপার, আমিনা কুতুব তার স্বামীর চেয়ে বয়সে প্রায় দশ বছরের বড়ো ছিলেন।
.
প্রায়ই আমিনা তার স্বামীকে জালিমের কারাগারে দেখতে যেতেন। তাকে সান্তনা দিতেন। কায়রো থেকে কানা জেলে যাওয়া একটা মেয়ের জন্য সহজ ব্যাপার ছিল না। ট্রেনে করে যেতে হতো। বিয়ের কয়েক বছর পর কামাল আল সানানিরি তার স্ত্রীর চেহারায় ক্লান্তি আর ধকল দেখতে পেলেন। তাই তিনি ডিভোর্সের দিকে ইঙ্গিত করে আমিনাকে একটি কবিতা পাঠালেন-
“আমি চাই না তোমার সুখের পথে কাঁটা হতে,
কিন্তু আমি যে পারব না জালিমের কথায় মাথা নোয়াতে।”
আমিনা সে কবিতার জবাব দিলেন প্রেমের মালা পরিয়ে-
“আমায় থাকতে দাও তোমার সাথে,
জিহাদের যে পথ নিয়ে যায় জান্নাতে।”
.
আমিনা হয়তো সেসময় কল্পনা করতে পারেননি, অপেক্ষার পালা ঠিক কতটুকু দীর্ঘ হবে। ১৭ বছর কারাবাসের পর কামাল ছাড়া পান। আমিনা ফিরে পান তার স্বামীকে। আমিনার ভাষায় সেটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে সুখের বছর। ভালোবাসার বছর। এতোদিন স্বামীকে তিনি দেখেছেন গারদের ওপাশ থেকে। আজ পেয়েছেন একদম কাছে। বাহুডোরে।
.
তবে সে সুখ বেশিদিন স্থায়ী হলো না। জালিম সরকার আবার কামালকে গ্রেফতার করে। এবার অত্যাচার এতই তীব্র ছিলো যে এক মাসের মাথায় কামাল আল সানানিরি তার রবের সানিধ্যে চলে যান। কামালের লাশ তার পরিবারের কাছে এই শর্তে সোপর্দ করা হয় যে, এর ওপর কোনো জানাযা পড়া হবে না।
.
আমিনার কানে পৌঁছায় স্বামীর মৃত্যুর খবর। যার পথ চেয়ে এতটা বছর একা ছিলেন তিনিই তো আর নেই। জীবনের বাকি ২৬ বছর তিনি স্বামীর স্মৃতিগুলো গভীর ভালোবাসায় হৃদয়ে ধারণ করে কাটিয়ে দেন। জান্নাতে কামালকে সাথী হিসেবে পাবেন এই আশায় আর কারো সাথে ঘর বাঁধেননি। আমিনা কুতুব একজন উচ্চ শিক্ষিতা রমণী ছিলেন। তারপরেও শুধু স্বামীর জন্য নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে আমৃত্যু কষ্ট করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা আমিনা কুতুবসহ সেসব ত্যাগী বোনদের ওপর রহম করুন, যারা এভাবেই তাদের স্বামীর কষ্টকে মাথা পেতে নিয়েছেন। জীবনসঙ্গীর প্রতি ভালোবাসায় দুনিয়ার লালসাকে বিসর্জন দিয়েছেন।
কামালের শোকে বিহ্বল হয়ে আমিনা একটি কবিতা লেখেন যা আজো মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে প্রতিধ্বনিত হয়-
.
هل ترانا نلتقي ام انها … كانت اللقيا على أرض السرابِ
و دفنا الشوق في اعماقنا … و مضينا في رضاء و احتسابِ
قد تعاهدنا على السيرِ معـًـا … ثم اعجلتَ مجيبـًا للذهابِ
فليعد قلبك من غفلاته … فلقاء الخلد في تلك الرحاب
قد تركت القلب يـدمي مثقلاا … تائها في الليل في عمق الضباب
لم يعد يبَرق في ليلي سَنااهُ … قد توارت كل انوار الشهاب
-
“তুমি কি চাও আবার আমাদের দেখা হবে?
নাকি দেখা হয়ে গেছে মরীচিকাতে?
আমাদের গভীর ভালোবাসা আমরা নিজেদের মধ্যেই কবর দিয়েছি,
আর আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশায় সংগ্রাম করেছি।
আমরা শপথ করেছিলাম, চলব সারাটা জীবন একসাথে,
ওগো! তুমি তো বিদায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত চলে গেলে।
ওগো! তুমি ঘুম থেকে সময়মত উঠে পড়বে,
কারণ, আমাদের আসল দেখা তো সেখানেই (জান্নাতে) হবে।
তুমি আমার হৃদয়টাকে ফেলে গেছো রক্তাক্ত অবস্থায়,
ফেলে গেছো গভীর রাতের গাঢ় কুয়াশায়।
আজ আর আমার রাতগুলো থেকে আলো আসে না,
তারাগুলোও আজ জ্যোতিহীন হয়ে হারিয়ে গেছে দূর অজানায়।”
(সংগৃহীত)

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন